ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কথিত অপতৎপরতার প্রতিবাদে বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে বিক্ষোভ, হট্টগোল, হেনস্তা ও হুমকির অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় কয়েকটি অফিসকক্ষে ভাঙচুরেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে হামলা, মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রদল।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবনে সিনা ভবন, প্রশাসন ভবন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, টিএসসিসি ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ও কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তার গোপন তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এ সময় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার ড. ইব্রাহীম হোসেন সোনা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের শাখা কর্মকর্তা টিটুল আহমেদ এবং টিএসসির সহকারী রেজিস্ট্রার বিপুল আহমেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন তারা। এ সময় কয়েকটি অফিসকক্ষে হুমকি ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে।
এদিকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাদের মারধর ও হেনস্তা করা হয়। পরে তাদের ‘ছাত্রলীগ’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
সিসিটিভি ফুটেজে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদ তৌফিক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সদস্য রেজাউল ইসলাম রাকিব, আব্দুল্লাহ আল নোমান, শাহরিয়ার রশিদ নিলয় ও খালেদ সাইফুল্লাহ এবং কর্মী রাহি, সাবিক, উল্লাস মাহমুদ, নাঈম, সিজান ও সাগর আলীসহ প্রায় ২৫-৩০ জন নেতাকর্মীকে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বলেন, তারা ইন্টার্নশিপের বিষয়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে বিভাগে গিয়েছিলেন। এ সময় কয়েকজন তাদের ‘আপনারা এখানে কেন এসেছেন’ বলে প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধর করা হয়। পরে তাদের ছাত্রলীগ ও ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন। বিষয়টি সহকারী প্রক্টরকে জানানো হলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তারা। ক্যাম্পাসে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, “গতকাল ১৫ আগস্ট উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। আজ আমি বিভাগের সভাপতির রুমে বসে ছিলাম। এ সময় কয়েকজন ছেলে এসে আমাকে বলেন, ‘আপনি গতকাল শেখ মুজিবকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন, কাল থেকে আর আসবেন না।’ এ সময় তারা আমাকে গালিগালাজ ও হুমকি-ধামকি দেয়। পরে তারা চলে যাওয়ার সময় আমার কয়েকজন ছাত্রকে মারধর করে চলে যায়।”
এবিষয়ে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক উম্মে আসমা লুনা বলেন, “আমরা কথা বলার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী হঠাৎ কক্ষে ঢুকে আমার সহকর্মীকে বাইরে যেতে বলেন। একপর্যায়ে তারা স্যারের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। একই সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপরও মারধর ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে। আমার শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায় যেমন কাম্য নয়, তেমনি আমার সহকর্মীর সঙ্গে অন্যায় আচরণও কাম্য নয়। বিষয়টি আমরা প্রক্টরকে জানিয়েছি। আশা করছি, তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।”
শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদ বলেন, “১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে পতিত আওয়ামী লীগের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ও বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়েছে। ক্যাম্পাসকে অশান্ত করতে তারা নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সবসময় অব্যাহত থাকবে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, “১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে কতিপয় ফ্যাসিস্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা শান্ত ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাদের অপতৎপরতা রুখতে ছাত্রদল প্রস্তুত। অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের কক্ষে এখনো শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ঝুলছিল। আমাদের কয়েকজন কর্মী গিয়ে সেটি নামিয়ে দিয়েছে। আমরা কাউকে মারধর বা কোনো ধরনের ভাঙচুর করিনি। প্রশাসনকে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি।”
এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আসাদ-উদ-দৌলা এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার জামিরুল ইসলাম।
