টানা পাঁচ দিন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২৪ জুলাই সীমিত পরিসরে সেবা চালু হয়। আর ইন্টারনেট ফিরতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ছড়িয়ে পড়ে ১৮ থেকে ২১ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতার ভিডিওচিত্র। এতদিন দেশের মানুষের চোখের আড়ালে থাকা ঘটনাগুলো মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। জনমনে ক্ষোভ আরও তীব্র হয় এবং আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ, ভবনের ছাদে অবস্থানরত এক কিশোরকে লক্ষ্য করে গুলি, সড়কে চলাচলরত তরুণকে গুলি, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং হেলিকপ্টার থেকে রাবার বুলেট নিক্ষেপের মতো বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। এসব ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনা বাড়তে থাকে।
তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে সেদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। একই সময়ে সরকারি নির্বাহী আদেশে সীমিত পরিসরে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ঘর থেকে বের হলেও গণপরিবহন ছিল অপ্রতুল এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সাভার ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে সরকার সমর্থকরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মেট্রোরেল, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন, সেতু ভবনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আনেন। একই সঙ্গে সরকার সমর্থক কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, ব্যবসায়ী, আমলা ও সাংবাদিক আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আটক করা হয়। পুলিশের তথ্যমতে, ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তে চিরুনি অভিযান পরিচালিত হয়। ২৪ ঘণ্টায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় ৬৪১ জনকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ ছিল, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন বিএনপি, জামায়াত ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা।
এদিন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক—আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের সন্ধান পাওয়া। ১৯ জুলাই থেকে নিখোঁজ থাকার পর তাদের চোখ বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি নতুন করে উদ্বেগ ও আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও চারজনের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২৪ জুলাই সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিটিভি ভবন, ডেটা সেন্টার, মেট্রোরেল স্টেশনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসব ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।
এদিকে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং শান্তিরক্ষী বাহিনীর লোগোসংবলিত যান ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও জোরদারের ঘোষণা বহাল রাখা হয়।
দিন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ২৪ জুলাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মোড় ঘোরানো দিন। পাঁচ দিনের তথ্য-অন্ধকার কেটে যাওয়ার পর দেশবাসী প্রথমবারের মতো আন্দোলনের সহিংস বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে। একই সঙ্গে গণগ্রেপ্তার, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আন্দোলন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে।
