শিক্ষার্থীদের আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করতে পারছে না রাকসু

প্রতিবেদক: ডেইলি সিটিজেন ভয়েস

বিপ্লব উদ্দীন, রাবি:
৩৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা আজ ধীরে ধীরে প্রশ্নের মুখে। চোখধাঁধানো প্রতিশ্রুতি আর পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ মাত্র ছয় মাসেই শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্ন পূরণে কতটা সফল তা নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ। ১২ মাসে ২৪ দফা ইশতেহার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানই এখন রাকসুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনের ছয় মাস পার হলেও অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব চোখে পড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে, আর রাকসুর কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। যে রাকসুকে ঘিরে শিক্ষার্থীরা নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন তাদের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা।

গত বছরের ১৬ই অক্টোবরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি (এজিএস) সহ মোট ২৩টি পদের ২০টিতে বিজয়ী হয় তারা। শিবির সমর্থিত প্যানেলের ঘোষিত ২৪ দফার ইশতেহারগুলোর মধ্যে ছিল বিশেষ করে মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণ, লাইব্রেরি ও রিডিং রুম সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা, চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকীকরণ, তথ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, অন-ক্যাম্পাস জব চালু, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন এবং ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন ক্যাম্পাস গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এখন পর্যন্ত তাদের ঘোষিত ২৪ দফা ইশতেহারের ৪ দফার কাজ দৃশ্যমান হয়েছে যা গড়ে মোট ইশতেহারের প্রায় ১৬.৬৭% এখনো প্রায় ৮৩.৩৩% বাস্তবায়ন করা বাকি। এক চতুর্থাংশের কাজ চলমান। এর মধ্যে মানসম্মত খাবারের জন্য নিয়মিত তদারকি, লাইব্রেরি সংস্কার ও এসি স্থাপনে সহযোগিতা, টিচার্স অ্যাভুলেইশন, ক্যম্পাসের রাস্তা সংস্কারসহ আবাসিক হলগুলোতে ফাস্ট এইড বক্স প্রদান, বেশ কিছু সভা সেমিনার ও কর্মশালা করেছে রাকসু।

শিবিরের ইশতেহারগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করলেও গত ছয় মাসে হতাশ হয়েছেন তারা। দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, হলের খাবারের নিম্নমান, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রত্যাশায় শিক্ষার্থীরা ছিলেন উদগ্রীব। রাকসুর দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ইশতেহারগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনে উঠেছে নানান প্রশ্ন।

হতাশার কথা জানিয়ে, ফিন্যান্স বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাব্বিরুল আজিজ আসিফ বলেন, রাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেল সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটকে নির্বাচিত করেছিল, তা পূরণে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ১২ মাসে ২৪টি সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, গত ৬ মাসে সেসব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম লক্ষ করা যায়নি। নির্বাচিত হওয়ার পর আবাসিক হলের খাবারের মানোন্নয়নে কিছু খণ্ডকালীন উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে তা আর অব্যাহত নেই। তবে সম্প্রতি লাইব্রেরি সংস্কারের বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা শোনা গেছে, যা ইতিবাচক দিক। কিন্তু সার্বিকভাবে প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই কাজ বাদ রয়েছে।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীর শাকিল আহমেদ বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন ছিল সকল শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া, অধিকার ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন স্বপ্নের প্রতীক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সংকট আবাসন সমস্যা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ  ৭২ বছরের ইতিহাসে ৬৩% শিক্ষার্থী এখনো পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার বাইরে। অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে অনিরাপদ ও ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবস্থায় থাকতে হচ্ছে এটি শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয় বরং শিক্ষাজীবনের মান, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে, রাকসু নির্বাচনের সময় এই সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই সমস্যাটি এখনো আমাদের প্রতিদিনের ভোগান্তির কেন্দ্রে রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আমাদের মেডিকেল সেন্টারের স্বাস্থ্যসেবা ও হল ডাইনিংয়ের মানোন্নয়নও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব, কাঙ্ক্ষিত সেবার ঘাটতি, নিম্নমানের খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এখনো আমাদের ভোগান্তিতে ফেলছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এসব ইস্যুতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে।কিন্তু কিছু ছোটখাটো পদক্ষেপ বা প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহীন মিয়া বলেন, দীর্ঘ ছত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ের অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের আবাসন সংকট নিরসনে, নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণে, মানসম্মত খাবার নিশ্চিতকরণে এবং নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, নির্বাচনের ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের ইশতেহার অনুযায়ী বেশ কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দীন আম্মার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চিন্তাধারা হল হাঁটুর বয়সি থার্ড ইয়ার ফোর্থ ইয়ারের ছেলেদের কাছে কেনো আমাদের জবাবদিহিতা করতে হবে। তাদের ব্যাপারটা হলো ডোন্ট কেয়ার ভাব। রাকসু কী জিনিস? এটা তারা দেখতে চাচ্ছে না।
সম্প্রতি এসি স্থাপন নিয়েও অনেক ঝামেলা হয়েছে। আমরা বলবো, প্রশাসনকে রাকসু কেনো সহযোগী হবে এটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার দরকার নেই। রাকসু প্রশাসনকে খোঁচা না দিলে আপনাদের কানে একথা যেত না যে শিক্ষার্থীদের এ সমস্যা এটা লাগবে। রাকসু মূলত এটাই চেয়েছে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাকসু জিএস বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের বলব রাকসু সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে কাজ করতেছে, খেলাধুলার বিষয় নিয়ে কাজ করতেছে, ডিবেট লিটারেচার নিয়ে কাজ করতেছে, এর বাহিরে অধিকারভিত্তিক কাজগুলোও রাকসু করতেছে। রাকসু কাজ হলো প্রশাসনকে চাপ সৃষ্টি করা, সেটা শতভাগই হচ্ছে। এছাড়া এখন নতুন প্রশাসন আমরা মোটামুটি এখনও বেগ পাচ্ছি না, আমরা আশা করছি রাকসুর সভাপতি বর্তমান ভিসি স্যার আমাদের প্রতি অনেক সাপোর্টিব হবে।

শিক্ষার্থীদের হতাশা এবং ইশতেহারের সিংহভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে রাকসুর ভিপি ও রাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও শিবির-সমর্থিত প্যানেল শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হল দখল ও গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ, পাশাপাশি ম্যাগাজিন, সাহিত্য আড্ডা ও বিভিন্ন দিবস উদযাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবাসন সংকট নিরসন, অনাবাসিক ভাতা, ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন ও মেডিকেল সেবা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্যানেলের কাজ ও অগ্রগতি অনেকটাই শিক্ষার্থীদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় তাদের ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এ বিষয়টা শিক্ষার্থীদের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। কারণ রাকসু নির্বাচন হয়েছিল শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে। শিক্ষার্থীই তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের আগে তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে রাকসুর সভাপতি হিসেবে আমি রাকসুর বডির কাছে এই বার্তা দিব যে তারা যেন নির্দিষ্ট মতাদর্শকে সাইডে রেখে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যে কাজ করে।’

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক:
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক:
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন

যোগাযোগ:
বাড়ি ০১, রোড নং-১১, সেক্টর- ১৩, উত্তরা ঢাকা-১২৩০

মোবাইল :
০১৭১৪-৯০৮৫৪৫

ইমেইল :
citizenvoicebd2020@gmail.com

সর্বশেষ

© All rights reserved © 2026 Dailycitizenvoice