ধূসর হলো রক্তিম আভা, ভেঙ্গে পড়েছে রাবির বর্ষীয়সী কৃষ্ণচূড়া

প্রতিবেদক: রাবি প্রতিনিধি:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে রঙিন ফুল, বিস্তৃত ডালপালা আর তীব্র রৌদ্রে স্বস্তির আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ছিল যে গাছটি, গ্রীষ্মের খরতাপে যে গাছ তার রক্তিম ফুলে স্নিগ্ধতা ছড়াত, ক্লান্ত দুপুরে শিক্ষার্থীদের দিত প্রশান্তির ছায়া সেই বর্ষীয়সী কৃষ্ণচূড়া গাছটি আজ আর দাঁড়িয়ে নেই। ছত্রাক ও উইপোকার আক্রমণে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে অবশেষে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে রাবির নানা ইতিহাসের সাক্ষী এই গাছটি। প্রাণবন্ত ও বিশালদেহী এই ছায়াদানকারী গাছটির পতনে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে নেমে এসেছে একরাশ শূন্যতা ও বিষাদ।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

ক্যাম্পাসের পরিবহণ মার্কেট সংলগ্ন সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক প্রথম বিজ্ঞান ভবনের সামনের এলাকায় এখন পড়ে আছে গাছটির বিশাল কাণ্ড। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডালপালা আর কাণ্ড দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, কতটা বিশাল ও রাজকীয় ছিল এর বিস্তৃতি। যে গাছের নিচে দিনজুড়ে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা, ছবি তোলা থেকে শুরু করে ভিডিও করা সবই চলত যার ছায়ায়; আজ সেখানে পড়ে আছে তার ভাঙা ডালপালা।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাছটির গোড়া থেকে শুরু করে কাণ্ডের বিভিন্ন অংশে পোকার গভীর ক্ষত রয়েছে। কাণ্ডের ভেতরের বড় অংশ ফাঁপা হয়ে গেছে। ছত্রাক, উইপোকা ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার দীর্ঘদিনের আক্রমণেই যে এই বিশাল বৃক্ষটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তা গাছটির ভাঙা অংশ দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এই কৃষ্ণচূড়া গাছটি ছিল বলে ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের। ভবনটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট নিজামুদ্দিন নামের এক কর্মচারী এই কৃষ্ণচূড়া গাছটি রোপণ করেন।

ভবনটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই গাছটি সেখানে ছিল। যত্ন, বিস্তৃতি ও সৌন্দর্যের কারণে গাছটির কদরও ছিল সবসময়। বছরের পর বছর ধরে কত হাজারো তরুণ-তরুণী এই গাছের নিচে বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ বুনেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। কালের পরিক্রমায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন, নতুন প্রজন্ম এসেছে; কিন্তু কৃষ্ণচূড়াটি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে একের পর এক প্রজন্মকে স্বাগত জানিয়েছে। আজ তার এই আকস্মিক পতন ক্যাম্পাসের সবাইকে যেন নাড়া দিয়েছে।

কৃষ্ণচূড়াটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অসংখ্য স্মৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছটি ভেঙে পড়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীরা আবেগঘন পোস্ট দিয়ে স্মৃতিচারণা শুরু করেন। ক্যাম্পাসের পুরোনো গাছগুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যে গভীর আবেগ জড়িয়ে থাকে, তা যেন নতুন করে ফুটে উঠেছে তাঁদের কথায়।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া হক মিথি বলেন, ‘গাছটির সঙ্গে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর লাখো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পুরো ক্যাম্পাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে গাছটি একটি। সেদিক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এখন গাছটার এমন করুণ অবস্থা দেখলে সত্যিই খুব খারাপ লাগবে।’

আখতারুজ্জামান রিসাত নামের এক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘হ্যাঁ, একটা গাছ, কৃষ্ণচূড়া। তিন-চার বছর হলো ওদিক দিয়েই যাওয়া-আসা করি। বারবার তাকাই, ফুল ফুটলে দূর থেকে দেখি। মাঝে মাঝে ছবি-টবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়াতাম। আর ভাবতাম, বহু বছর পর ক্যাম্পাসে এলেও যেন গাছটি থাকে। একাকী তার নিচে দাঁড়িয়ে দু-চারটি স্মৃতিচারণ করা যাবে। যাক, আপাতত ভালো থেকো ফুল।’

গাছটির ঠিক পাশেই দীর্ঘদিন ধরে খাবারের দোকান চালান মিজান। তাঁর চোখেও গাছটির পতন যেন পরিচিত এক দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলার মতো।

তিনি বলেন, গাছটি তাঁর ব্যবসার সঙ্গী ছিল অনেক বছর ধরে। প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীরা যখন ঘেমে-নেয়ে আসত, তখন এর নিচেই দাঁড়াতেন এবং তাঁর দোকানেও আসা-যাওয়া করতেন। কয়েক মাস ধরেই তিনি দেখছিলেন, গাছটির পাতাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ডালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে ভেতরে যে পোকা বাসা বেঁধেছে, তা বুঝতে পারেননি। গাছটা যখন হুড়মুড় করে পড়ে গেল, তখন মনে হলো আপন কেউ একজন চলে গেল। এখন এই কাঠফাটা রোদে জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে।’

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এ.কে.এম. আজহারুল ইসলাম বলেন, গাছটি অনেক পুরোনো। আমার যোগদানের পর থেকেই গাছটি দেখছি। কালক্রমে এটা সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. এম. মনজুর হোসেন জানান, পুরোনো বড় গাছ একটি ক্যাম্পাসের অমূল্য পরিবেশগত সম্পদ। এসব গাছ শুধু ছায়াই দেয় না, ক্যাম্পাসের মাইক্রো-ক্লাইমেট বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পাখিদের আশ্রয়স্থল তৈরি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ বিষয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ.এইচ.এম. মাহবুবুর রহমান বলেন, গাছটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই লাগানো হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বয়সের কারণে সময়ের সঙ্গে গাছটির মূল দুর্বল হয়ে পড়ে। মাটির নিচের দুর্বল মূলের ওপর ভর করেই গাছটি দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ওপরের অংশে শাখা-প্রশাখা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় গোড়ার পক্ষে অতিরিক্ত ভার বহন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই গাছটি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া গাছটির কাণ্ডের ভেতরে পোকামাকড়ের আক্রমণের চিহ্নও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে। অনুকূল পরিবেশে এবং কাণ্ডে পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ শতাধিক বছর, এমনকি প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল আলম বলেন, কৃষ্ণচূড়া গাছের কাণ্ডের ভেতর ফাঁপা হয়ে যাওয়াকে ‘হার্ট রট’ নামের একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগের ফল হিসেবে দেখা যায়। এ রোগে গাছের কাণ্ডের ভেতরের শক্ত ও মৃত কাঠ, যাকে ‘হার্টউড’ বলা হয়, ধীরে ধীরে পচে যায় এবং কাণ্ড ফাঁপা হয়ে পড়ে। ফলে বাইরে থেকে গাছটি শক্ত ও স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের কাঠের শক্ত অংশ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। গ্যানোডার্মা বা ফোমিটপসিস জাতীয় কাঠ-পচনকারী ছত্রাক এ ধরনের রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। এ ছাড়া উইপোকার আক্রমণও গাছের কাণ্ড দুর্বল ও ফাঁপা হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, উদ্ভিদের এ ধরনের রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে এখনও পর্যাপ্ত বিশেষায়িত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী গাছের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, একদিন এই জায়গায় নতুন কোনো কৃষ্ণচূড়া গাছ বেড়ে উঠবে, গ্রীষ্মে আবারও রক্তিম ফুলে রাঙবে ক্যাম্পাস। কিন্তু পুরোনো সেই গাছটি আর ফিরবে না। পড়ে থাকা ভাঙা কাণ্ড আর ছড়িয়ে থাকা ডালপালাই এখন তার শেষ চিহ্ন। তবে গাছটির ছায়ায় জমে থাকা গল্পগুলো থেকে যাবে শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে। একসময় যে কৃষ্ণচূড়া ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের অংশ ছিল, এখন সেটি হয়ে গেছে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর স্মৃতির অংশ।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক:
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক:
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন

যোগাযোগ:
বাড়ি ০১, রোড নং-১১, সেক্টর- ১৩, উত্তরা ঢাকা-১২৩০

মোবাইল :
০১৭১৪-৯০৮৫৪৫

ইমেইল :
citizenvoicebd2020@gmail.com

সর্বশেষ

© All rights reserved © 2026 Dailycitizenvoice