বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসের কাজের অগ্রগতি, মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মদক্ষতা এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় রদবদল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সামনে আরও রদবদল হতে পারে। এতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বাড়ছে চাপ ও জবাবদিহিতা।
শুক্রবার চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর স্থলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন প্রতিবেদন এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে। পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাজেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রী-এমপিদের ওপর বাড়ছে চাপ
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ সংকট এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রতিদিনের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার সংস্কৃতিও জোরদার হয়েছে। সকালে দেওয়া নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে, তা দিনের শেষভাগে বা পরবর্তী সময়ে জানাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ও ‘কুইক রেসপন্স’ নীতির কারণে মন্ত্রী, এমপি ও কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের চাপ বেড়েছে।
তিন মাস পরপর মূল্যায়নের উদ্যোগ
মন্ত্রী-এমপিদের শুধু সরকারের কাছে নয়, দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছেও জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর সভার মাধ্যমে মন্ত্রীদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ দলীয় নেতা-কর্মীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দলীয় এমপিদের নিজ নিজ এলাকার তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি চাপ
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। একদিকে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে সরকারের রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়টিকে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় যাজকদের সম্মানি ভাতা, হেলথ কার্ড এবং খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও চাপ
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ও বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মন্ত্রণালয়টির ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়েছে।
অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও কঠোরভাবে কাজ করতে হচ্ছে।
খাল খনন ও বৃক্ষরোপণে বড় টার্গেট
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওপরও রয়েছে বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যও রয়েছে।
জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতেও চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবে তৈরি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। দেশীয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ও মানুষের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ চাপের মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার নানা সমস্যা মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওপরও রয়েছে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব। নতুন রেললাইন নির্মাণ, যানজট নিরসনে এআই ট্রাফিক লাইট, নারীদের জন্য আলাদা বাস, ঢাকার চারপাশে ওয়াটার বাস এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্প বাস্তবায়নেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দুর্নীতি ও অনিয়মে ‘জিরো টলারেন্স’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে পদ-পদবি বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও কাজে যুক্ত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও ব্যস্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাজের গতি বাড়াতেই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, নতুন কয়েকটি উইং চালু করা হয়েছে এবং অবৈধ অভিবাসন বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ চলছে।
জহির উদ্দিন স্বপন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সরকার গঠনের ছয় মাস পর মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েকজনের দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। জহির উদ্দিন স্বপনের স্থলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ।
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময় পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে মন্ত্রিসভায় যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ওপর প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি ও কাজের মূল্যায়ন আরও জোরদার হয়েছে। সামনে আরও রদবদল হলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
