এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ২০২৬ এর ফলাফলে নওগাঁর মান্দা উপজেলায় শিক্ষার চরম চিত্র ফুটে উঠেছে। উপজেলার ১৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিতেই পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমেছে।

এর মধ্যে মান্দা শ্যাম চাঁদ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। একইভাবে ঘনা আদর্শ কলেজের একমাত্র পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। ফলে প্রতিষ্ঠান দুটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
জানা যায়, মান্দা শ্যাম চাঁদ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা সবাই মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থী ছিল। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৫ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। ২০১৩ সালে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক স্বীকৃতি থাকলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই।
প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সবচেয়ে শোচনীয় ফল করেছে সতিহাট কে.টি কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১ জন। পাসের হার ৫.৫৬ শতাংশ।
দক্ষিণ মৈনম কলেজ থেকে ২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২ জন; প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৮ শতাংশ। কালিকাপুর চক কালিকা কলেজ থেকে ১১ জনের মধ্যে পাস করেছে ১ জন, যেখানে পাসের হার ৯.০৯ শতাংশ।
এ ছাড়া ফতেপুর কলিমুদ্দিন কলেজে পাসের হার ১০.৬৪ শতাংশ, ইনডেক্স টেকনিক্যালে ১২.২৫ শতাংশ, গোটগাড়ী শহীদ মামুন কলেজে ১৩.১৯ শতাংশ, পানিয়াল আদর্শ কলেজে ১৬ শতাংশ, মান্দা মহানগর কলেজে ১৮.৮৮ শতাংশ, জোত বাজার মহিলা কলেজে ১৯. ৮১ শতাংশ এবং উত্তরা কলেজে ১৯.৮১ শতাংশ।
অন্যদিকে, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিছিয়ে রয়েছে। ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এর মধ্যে মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ৫ জন এবং মান্দা মমিন শাহানা কলেজ থেকে ২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাকি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।
এমন ফলাফলে উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থার মান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদান কার্যক্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিতে পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে মান্দা শ্যাম চাঁদ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান শিক্ষার্থী ভর্তি ও ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে জানান, এলাকার অন্যান্য মহাবিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ায় অপেক্ষাকৃত ঝরে পড়া, দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীরা মূলত এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আসে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এসব শিক্ষার্থীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষক সংকটের বিষয়ে অধ্যক্ষ জানান, প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ইংরেজি বিষয়ে কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। ২০১৩ সালে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অনেকে এমপিওভুক্তির সুযোগ না থাকায় এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তি বা নিবন্ধনের সুযোগ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন। ফলে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
একাডেমিক স্বীকৃতি থাকলেও এমপিওভুক্তি না হওয়া এবং শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি। তবে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের সাধ্যমতো মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার এমন হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ, শিক্ষক সংকট নিরসন, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা কার্যক্রমে কার্যকর তদারকি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অথচ এমপিওভুক্তির বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় উপজেলার শিক্ষার মান আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
