রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে ভাইভা বোর্ডের সুপারিশ করা দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে বাদ দিয় চতুর্থ স্থানের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের বিপরীতে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেছেন, আলোচিত তালিকাটি কোনো মেধাতালিকা ছিল না; বরং জ্যেষ্ঠতা, উচ্চতর ডিগ্রি, প্রকাশনা, অভিজ্ঞতা ও মৌখিক পরীক্ষার পারফরম্যান্স বিবেচনায় নামের ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে তিনি জানান যে, সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ প্রক্রিয়া উপস্থাপনের আগে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে তাঁকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডেকে আনা হয় এবং সেখানে তাঁকে জানানো হয় পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও, কেবল তিনজন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর তিনি চূড়ান্ত তিনজনের মেধাতালিকায় স্বাক্ষর করতে গিয়ে লক্ষ করেন যে পূর্বে সুপারিশকৃত তালিকার একজন প্রার্থীর ক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীর জায়গায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা তিনি অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করে আপত্তি জানান। ফলে তিনি চূড়ান্ত তালিকায় স্বাক্ষর না করে কেবল হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। যদিও তাঁর এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই পরবর্তীকালে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় ওই নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান তাঁর ব্যাখ্যায় বলেন, প্রথমে উর্দু বিভাগে তিনজন প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে একই ধরনের আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ায় প্ল্যানিং কমিটি ও রেজিস্ট্রার দপ্তর সেটিকে মোট ছয়টি পদের ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়োগ বোর্ডকে সিদ্ধান্ত জানায়। সেই অনুযায়ী বোর্ডের দিন ছয়জনকে সুপারিশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই ছয়জনের তালিকা প্রস্তুতের সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পারফরম্যান্সের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠতা, পিএইচডি ডিগ্রি, গবেষণা প্রকাশনা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে নামের যে ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি কেবল উর্দু বিভাগে শিক্ষক তালিকায় কার নাম আগে বা পরে হবে সেটি ঠিক করার জন্য ব্যবহৃত হয়, মেধাক্রম হিসেবে নয়।
ফরিদ উদ্দীনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ বোর্ডের দু-এক দিন পর বিষয়টি তৎকালীন প্রশাসনের নজরে আসে যে দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিটি আসলে নতুন বিজ্ঞপ্তি নয়, বরং আগের তিনটি পদের পুনঃবিজ্ঞপ্তি ছিল। ফলে মোট পদসংখ্যা ছয় নয়, তিনটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর আবার বোর্ডের সদস্যদের ডেকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও লিখেছেন, তখন আগের ছয়জনের তালিকার প্রথম তিনজনকে সরাসরি রেখে দেওয়ার বিষয়ে বাইরে থেকে আসা একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য মত দিলেও বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য মনে করেন, আগের তালিকাটি যেহেতু মেধাক্রম ছিল না, তাই নতুন করে তিনজন নির্ধারণ করতে হবে। এ অবস্থায় নিজ বিভাগ হতে পাশ করা প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে ৫০ বছর বয়সী অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা একজন প্রার্থীকে আমরা সুপারিশ করিনি।
এদিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি ‘জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ফরিদ উদ্দীনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, আলোচিত দ্বিতীয় অবস্থানটি পরীক্ষাভিত্তিক মেধাক্রম ছিল না; বরং উচ্চতর ডিগ্রি ও জ্যেষ্ঠতার কারণে বিভাগের শিক্ষকদের তালিকায় কার নাম আগে এবং পরে যাবে, সেই হিসেবেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নাম তালিকায় আগে ছিল।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীনের সাথে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘আসলে সবকিছু বিবেচনা করে সিনিয়রদের আগে রাখা হয়। যদি কারও পিএইচডি থাকে, তার নাম পরে আসলে বিষয়টি দৃষ্টিকটু লাগে। এজন্য সাধারণত যারা সিলেক্টেড হন, তাদের মধ্য থেকে একটি লিস্ট তৈরি করা হয়। যেটি কোনো মেধাক্রম নয়। বরং কার নাম কোথায় থাকবে তা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত যিনি ওই ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র অথবা যিনি আগে পাশ করেছেন, তাকে আগে রাখা হয়। এটি মূলত একটি প্রচলিত রীতি বা সাজানোর পদ্ধতি মাত্র।’
তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে যখন দেখা গেল দুটো বিজ্ঞপ্তি নয়, বরং দ্বিতীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটা হলো প্রথম বিজ্ঞপ্তিরই পুনঃবিজ্ঞপ্তি। তখন সমালোচনা এড়াতে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর আলোচনা ওঠে কোন তিনজনকে রাখা হবে। তখন আমরা বলি, মেধার ভিত্তিতে যারা ভালো করছে তাদেরই নির্বাচন করা হবে। কিন্তু বোর্ডে বাইরে থেকে যিনি ছিলেন, তিনি বলেন যে, আগে যেহেতু আমরা লিস্ট করেছি, তাই প্রথম তিনজনকে রেখে পরে তিনজনকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবা হোক। কিন্তু সেটা তো অন্যায় হবে।
তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, যারা লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে তাদের প্রথম তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে দেখা যায়, প্রথম তিনজনের একজন বাদ পড়ে যান। কিন্তু সেই শিক্ষক বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেননি। কারণ তাঁর নিজের বিভাগের শিক্ষার্থী বাদ পড়ছিলেন।
প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশের বিষয়ে ফরিদ উদ্দীন বলেন, ‘তাদের নম্বর প্রকাশ করা এখন সম্ভব নয়। এটা বোর্ডের একান্ত বিষয়। যদি কোনো তদন্ত কমিটি হয়, তখন এটা প্রকাশ করা যাবে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে রয়েছে। কিন্তু যার কথা বলা হচ্ছে সে রিটেনও ফার্স্ট হয়নি কিংবা অন্য কোনোটাতেও ফার্স্ট হয়নি। কিন্তু সে আসলে অনেক সিনিয়র, অনেক পাবলিকেশন আছে এবং তার পিএইচডি আছে, তার পাশাপাশি অন্য জায়গায় শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতাও আছে, সেগুলো চিন্তা করে তাকে প্রথম দিকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু মেধার ভিত্তিতে তাকে প্রথমে রাখা হয়নি। এটাই ছিল আমাদের আর্গুমেন্ট।
তবে সব অভিযোগকে নাকচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (নিয়োগকালীন সময়ের উপাচার্য) অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ‘নিয়োগ প্রসঙ্গে কেউ যদি তথ্য জানতে চায়, আসুক সমস্যা নেই। নিউজগুলোতে যেই পরিমাণে মিথ্যা এবং নোংরা কথাবার্তা বলা হয়েছে, তার চেয়ে বরং কেউ এসে দেখুক কোথাও এক বিন্দু ও এক চুল পরিমাণ আইনের তারতম্য হয়েছে কি না।
উর্দু বিভাগের যে ৬ জনকে শর্টলিস্টে সিলেক্ট করা হয়, তাদের প্রাপ্ত নম্বরের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক উপাচার্য বলেন, তাদের প্রত্যেকের প্রাপ্ত নম্বর রেজিস্ট্রার অফিসে আছে। আমি খুব খুশি হব যদি কেউ এই নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে। খতিয়ে দেখলে সত্যটি বের হয়ে আসবে।
তিনি আরও বলেন, এইসব মিথ্যা নোংরামিগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। কারণ পৃথিবীতে এত পরিমাণে মিথ্যা ও নোংরামি যে রয়েছে, তা এখানে না আসলে আমি বুঝতাম না।