শিশুর অধিকার ও ভবিষ্যৎ: পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: রাজশাহী প্রতিনিধি:

শিশুরা শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়, তারা বর্তমান সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, মতামত, মর্যাদা ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের একদিকে যেমন অনেক শিশু নিজেদের উদ্যোগে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে অন্য একটি অংশ এখনো শিশুশ্রম, দারিদ্র্য, সহিংসতা, বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, প্রতিবন্ধকতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নানা ঝুঁকির মধ্যে বেড়ে উঠছে।

শিশুদের একটি অংশ এখন নিজেদের সমস্যা নিজেরাই চিহ্নিত করছে। বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, গাছ লাগানো, পরিবেশ রক্ষা, সহপাঠীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি কিংবা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে তারা। বয়সে ছোট হলেও এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে অনেক শিশু।

তবে সব শিশুর জন্য পরিস্থিতি একই নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হতে হয়। কেউ কাজ করছে দোকান, কারখানা, ওয়ার্কশপ কিংবা পরিবহন খাতে; আবার কেউ রাস্তায় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এসব শিশুর অনেকেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে যে বয়সে বই খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সে বয়সেই তাদের কাঁধে উঠে আসছে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব।

পথশিশুদের জীবন আরও অনিশ্চিত। নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত খাবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত থাকায় তারা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। একইভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য উপযোগী শিক্ষা পরিবেশ, সহায়ক প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা তৈরি করতে পারে।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নির্যাতনও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। পরিবার, বিদ্যালয় কিংবা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে শিশুরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে পারে। অনেক ঘটনা আবার প্রকাশ্যে আসে না। ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে শিশুরা অনেক সময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলতে পারে না। ফলে শিশু সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ও সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষাই বদলের প্রধান হাতিয়ার

শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নয়, প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। একটি শিশু তার বয়স অনুযায়ী পড়তে, লিখতে, বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় হিসাব করতে পারছে কি না ,তার ওপরও শিক্ষার মান নির্ভর করে।

দারিদ্র্য, দূরত্ব, পারিবারিক সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা কিংবা সামাজিক নানা কারণে কিছু শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে যায়। আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও নিয়মিত উপস্থিতি ও শেখার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিশুবান্ধব পাঠদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েশিশুদের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেয়েশিশুকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নেওয়া নয়; বরং তার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। একইভাবে ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়কেই ছোটবেলা থেকে সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে।

জেন্ডার বৈষম্য ও বাল্যবিবাহের বাধা

ছেলে ও মেয়েশিশুর জন্য আলাদা সুযোগ কিংবা আলাদা প্রত্যাশা তৈরি করা এখনো সমাজের অনেক জায়গায় দেখা যায়। খেলাধুলা, শিক্ষা, মতামত প্রকাশ কিংবা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মেয়েশিশুদের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লে তাদের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাল্যবিবাহ এই বৈষম্যের অন্যতম বড় উদাহরণ। অল্প বয়সে বিয়ে হলে একটি মেয়েশিশুর শিক্ষা ও নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। তাই পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তবে জেন্ডার সমতা শুধু মেয়েশিশুর বিষয় নয়। ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়ের জন্য সমান সুযোগ এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও শিশুরা ঝুঁকিতে

জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের জীবনেও নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা কিংবা লবণাক্ততার মতো বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায়।

দুর্যোগের সময় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। কোনো পরিবার নদীভাঙন বা দুর্যোগের কারণে অন্য এলাকায় চলে গেলে শিশুর পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। পরিবারের আয় কমে গেলে শিশুশ্রমের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার নিরাপদ পানি, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সংকটও শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাই শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। শিশুদের জন্য দুর্যোগকালীন শিক্ষা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

শরণার্থী শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে

বাসস্থান হারানো শিশুদের জন্য অনিশ্চয়তা আরও গভীর। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়েই তাদের নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এসব শিশুর অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কেউ শিক্ষক হতে চায়, কেউ চিকিৎসক, কেউ পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ জীবন চায়। তাদের সেই স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষা, সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসা-বাণিজ্যেও শিশুর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ

শিশু অধিকার শুধু পরিবার, বিদ্যালয় বা সরকারের বিষয় নয়; ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি পণ্য বাজারে আসার আগে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। এই দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও শিশুশ্রম বা শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে কি না, সেটিও নজরদারির বিষয়।

দায়িত্বশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচিত কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখা, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ একজন শ্রমিকের আয় ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে তার পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার বিষয়টিও জড়িত।

একইভাবে শিশুদের জন্য তৈরি পণ্য ও সেবা নিরাপদ কি না এবং বিজ্ঞাপন ও বিপণনে শিশুদের অধিকার ও মর্যাদা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

টেকসই উদ্যোগ

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শিশু কল্যাণে কাজ করছে। কোথাও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, কোথাও স্বাস্থ্যসেবা, কোথাও পরিবেশ রক্ষা কিংবা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে শুধু এককালীন সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এসব উদ্যোগের লক্ষ্য। কোন এলাকায় কী প্রয়োজন, কতজন শিশু উপকৃত হচ্ছে এবং উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবে কী পরিবর্তন আসছে এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার।

পরিবেশগত, সামাজিক ও শাসনব্যবস্থার আলোচনাতেও শিশু অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরিবেশ রক্ষা, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, সমতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সঙ্গে শিশুদের কল্যাণকে যুক্ত করা গেলে করপোরেট উদ্যোগের সামাজিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।

শিশুরাই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু

একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানে শুধু তাকে একটি ভালো বর্তমান দেওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতের একটি দায়িত্বশীল প্রজন্ম তৈরি করা। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করা, সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধ, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং শরণার্থী ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।

শিশুদের নিজেদের উদ্যোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কোনো কর্মসূচির প্রয়োজন হয় না। একটি গাছ লাগানো, একজন বন্ধুকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলা কিংবা বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখার মতো ছোট উদ্যোগও সমাজে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাই শুধু রাষ্ট্রের নয়, পরিবার, বিদ্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজের প্রতিটি মানুষের। শিশুদের নিরাপদ, সমতাভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ দিতে পারলেই তাদের স্বপ্নের সঙ্গে এগিয়ে যাবে একটি সম্ভাবনাময় সমাজ।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক:
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক:
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন

যোগাযোগ:
বাড়ি ০১, রোড নং-১১, সেক্টর- ১৩, উত্তরা ঢাকা-১২৩০

মোবাইল :
০১৭১৪-৯০৮৫৪৫

ইমেইল :
citizenvoicebd2020@gmail.com

সর্বশেষ

© All rights reserved © 2026 Dailycitizenvoice