চাঁপাইনবাবগঞ্জে আদালতের এজলাস কক্ষ ও বিচারকের খাসকামরার দরজা ও জানালা ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। রবিবার (০৯ আগস্ট) দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষ এবং যু্গ্ম জেলা জজ মো. উজ্জল মাহমুদের খাসকামরায় এই ভাংচুর চালানো হয়।
জানা যায়, ২০২৪ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে রাতের অন্ধকারে জেলা নির্বাচন অফিসের দেয়ালে ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় ওয়ারেন্ট হলে যুবদল নেতা তুফান আলীকে গতকাল রাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। আজ সেই মামলার শুনানি চলাকালীন সময়ে অন্য ৪ আসামীর (বিএনপি নেতা) জামিন মঞ্জুর করলেও তুফানের বিষয়ে সিধান্ত দেয়নি আদালত। এরপরই আদালতের এজলাস ও বিচারকের খাসকামরায় ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা বিচারক উজ্জল মাহমুদকে ফ্যাসিস্টদের দোসর উল্লেখ করে আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে অপসারণের আল্টিমেটাম দেন। দাবি আদায় না হলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারী দেন তারা। ঘটনার পরপরই আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে৷
আদালত সূত্রে জানায়, ওয়ারেন্ট থাকা বাকি ৪ বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীকে জামিন মঞ্জুর করলেও এজলাস কক্ষের ভিডিও ধারন করছিলেন নেতাকর্মীরা। এসময় বিচারক ভিডিও ধারন করতে নিষেধ করে এবং লোডশেডিং থাকায় অতিরিক্ত লোকজনকে এজলাস কক্ষ ত্যাগের জন্য বলার পরপরই ক্ষিপ্ত হন নেতাকর্মীরা। এসময় এজলাস কক্ষে ধাওয়া করে দরজা জানালা ভাংচুর করলে বিচারক উজ্জল মাহমুদ খাসকামরায় চলে যান। পরে সেখানকার দরজাতেও ভাংচুর করে ও স্লোগান দেয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।
এদিকে, ভাংচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, যুবদল নেতা তুফানের জামিনের বিষয়টি উপস্থাপন করা হলেও তা নিয়ে টালবাহানা করেন বিচারক। এমনকি বিদ্যুতের বিষয়েও সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন। এসময় তিনি (বিচারক) উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের সময়েই বিদ্যুতের অবস্থা ভালো ছিল। এরপরই নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হলে হট্টগোল হয়।
মামলার আসামী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব বাবর আলী রুমন ও জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মিম ফজলে আজিম বলেন, বিচারক বিচারকাজ করবেন নিরপেক্ষ ও স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তিনি বিচারকাজ চলার সময়েও বর্তমান সরকারকে নিয়ে বিদ্রুপ মন্তব্য করেছেন। এসময় তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জের বলে জানান। আমাদের ধারনা, তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর। তা না হলে আওয়ামী লীগের সময়ে করা মিথ্যা বানোয়াট রাজনৈতিক মামলায় নিরপরাধ নেতাকর্মীদের হয়রানি করতেন না। আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানায়।
আসামীপক্ষের আইনজীবী ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাড. রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, আদালতের নথি ও কার্যকালী তালিকার সাথে গড়মিল থাকায় গত ধার্য তারিখে বিঞ্জ বিচারক আসামিদের ওয়ারেন্ট ইসু করেন। বিষয়টি আমি প্রমাণ স্বরুপ কাগজপত্র বিঞ্জ বিচারকের কাছে পেশ করি এবং বিঞ্জ বিচারক চার আসামির জামিন মঞ্জুর করেন। এসময় আদালতে বিদ্যুৎ না থাকায় বিচারক মন্তব্য করায় উপস্থিত নেতাকমীদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এসময় কেউ কেউ ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের নিষেধ করলে আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল ওদুদ বলেন, নির্বাচন অফিসের পেছনে ককটেল হামলার ঘটনায় তাদেরকে আসামী করা হয়। তারা জামিনে ছিল। কিন্তু একটি তারিখ মিস হওয়র কারনে ওয়ারেন্ট হয়ে যায়। তারা আদালতে আজ আত্নসমর্পণ করে। চারজনের জামিন মঞ্জুর করে আদালত। পুলিশের হাতে আটক একজন আসামীর জামিনের আবেদনের আগেই বিচারক নেমে যান। কথোপকথনের এক পর্যায়ে এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। এটি বহিরাগতদের কাজ। এ ঘটনার জন্য আমি বিশ্বাস করি, এটি কোনভাবেই কাম্য নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাসিব জানান, ৫ আগস্টের পর যেসব মব কালচারের সৃষ্টি হয়েছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। এটি বিচার বিভাগের প্রতি হুমকি স্বরুপ ঘটনা। আমি মনে করি, যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত।
আদালতের নিরাপত্তা বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আপতত সবকিছুই স্বাভাবিক আছে।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়ে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বিচারকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জোর নিরাপত্তা চেয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিচারকের খাস কামরা ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
