কণ্ঠস্বর নকল করে ফোনে প্রতারণা, রুয়েট শিক্ষার্থীদের পরিবার টার্গেট প্রতারক চক্র

প্রতিবেদক: রুয়েট প্রতিনিধি:

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একাধিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যকে ফোনে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে একটি প্রতারক চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে কিংবা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ভুয়া তথ্য দিয়ে অভিভাবকদের আতঙ্কিত করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বরের মতো শব্দও শোনানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

প্রতারক চক্রের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

২০২১–২০২২ শিক্ষাবর্ষের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তালহা বিন কবির জানান, গত ১০ আগস্ট তাঁর বাবার কাছে ফোন করে বলা হয়, তাঁকে ইয়াবাসহ মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় আটক করা হয়েছে। ফোনদাতারা দাবি করেন, তিনি ভালো ছেলে হলেও সঙ্গে থাকা অন্যদের কারণে এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন।

পরে তাঁকে মুক্ত করার জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং পরবর্তীতে ছাড়িয়ে আনতে এক লাখ টাকা লাগবে বলেও ভয় দেখানো হয়।

তালহা বিন কবির বলেন, “স্ক্যামাররা আমার হুবহু ভয়েস শোনায়। যেটা হয়তো এআই জেনারেটেড। আমাকে আঘাত করা হচ্ছে—‘বাঁচাও, বাঁচাও, আব্বু আব্বু’—এভাবে চিৎকার করছি। আমি সেই সময় এক্সাম দিচ্ছিলাম, ফলে আমার ফোন বন্ধ ছিল।”

তিনি জানান, ফোনে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে তাঁকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিত হন যে পুরো ঘটনাটি মিথ্যা।

এ ধরনের ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তালহা। পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের রুমমেট, সহপাঠী কিংবা শিক্ষকদের যোগাযোগ নম্বর সংরক্ষণে রাখার পরামর্শ দেন, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়।

একই ধরনের ঘটনার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন ২০২৪–২০২৫ শিক্ষাবর্ষের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী তাকী মাহমুদ। তাঁর বাবার কাছে ফোন করে প্রতারকরা দাবি করে, তিনি মাদকসহ আটক হয়েছেন এবং বিষয়টি গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চলে যাবে।

তাঁর কণ্ঠস্বর নকল করে শোনানোর পাশাপাশি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অর্থও দাবি করা হয়। তবে কথাবার্তায় সন্দেহ হওয়ায় তাঁর মা দ্রুত ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ঘটনাটি প্রতারণা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

তাকী মাহমুদ বলেন, “এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে। আমার পরিবার প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। পরে আমার সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত হয় যে সবকিছুই মিথ্যা।”

তিনি সবাইকে এ ধরনের প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

এদিকে ২০২৩–২০২৪ শিক্ষাবর্ষের মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শোয়েব বিন জামানও একই চক্রের প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একবার তাঁর বাবার কাছে ফোন করে তাঁকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে বলে জানিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এ ছাড়া সম্প্রতি তাঁর বাবা অসুস্থ—এমন তথ্য দিয়েও প্রতারণার চেষ্টা করা হয়। তবে সন্দেহ হওয়ায় তিনি প্রতারকদের ফাঁদে পড়েননি।

এর আগে পুরকৌশল বিভাগের ২০২৪–২০২৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর বাবার কাছ থেকেও একই কৌশলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবার কাছে ফোন করে জানানো হয়, তাঁকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে এবং তিনি ফোনদাতাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন।

দ্রুত টাকা না পাঠালে তাঁর ক্ষতি হতে পারে বলেও ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে প্রতারকরা শিক্ষার্থীর কণ্ঠসদৃশ কান্নার শব্দ শোনায় এবং ‘বাবা, আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে’—এ ধরনের কথা শোনানো হয়।

এতে তাঁর বাবা বিষয়টি সত্য বলে বিশ্বাস করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হলে ছেলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি ৯ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি প্রতারণা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এ বিষয়ে রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, “শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

একাধিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা ঘটায় রুয়েট শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর নকল করে পরিবারের সদস্যদের কাছে শোনানো এবং মাদক মামলা, আটক কিংবা ক্ষতির ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করার ঘটনায় প্রতারকদের কৌশল নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ফোন পেলে আতঙ্কিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পাঠানো উচিত নয়। প্রথমে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে সহপাঠী, রুমমেট, শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে কেউ প্রতারণার শিকার হলে অর্থ লেনদেনের তথ্য, ফোন নম্বরসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক:
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক:
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন

যোগাযোগ:
বাড়ি ০১, রোড নং-১১, সেক্টর- ১৩, উত্তরা ঢাকা-১২৩০

মোবাইল :
০১৭১৪-৯০৮৫৪৫

ইমেইল :
citizenvoicebd2020@gmail.com

সর্বশেষ

© All rights reserved © 2026 Dailycitizenvoice