ইসলামী বিশব্বিদ্যালয় (ইবি) প্রশাসন ‘জুলাই-৩৬ গণ-অভ্যুত্থান’-এর দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আনন্দ র্যালি, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, আলোচনা সভা, প্রীতি ভলিবল প্রতিযোগিতা, ক্যাম্পাসজুড়ে আলোকসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টা ২০ মিনিটর দিকে প্রশাসন ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এমতাজ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপাচার্য বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এসময় ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে আনন্দ র্যালির আয়োজন করা হয়।
র্যালি শেষে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস শাহীদ মিয়ার সভাপতিত্বে জুলাই শহীদদের স্মরণে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ এমতাজ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোঃ ইদ্রিস আলী এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোঃ মনজুরুল হকসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মোঃ ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে আমরা পুকুরে শিক্ষার্থীর লাশ দেখেছি, একই সঙ্গে নিজ বিভাগে শিক্ষকের লাশও দেখেছি। ৪ আগস্ট যারা ‘ফাইনাল খেলার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, জুলাই-পরবর্তী প্রশাসন তাদের অবাধে চলাফেরার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই ফ্যাসিস্ট শিক্ষক মাহবুব আবারও তৎপর হয়ে প্রায় ৪০০ শিক্ষককে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা বর্তমান প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। তিনি বলেন, ওই শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনরায় আইনের আওতায় আনতে হবে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এস এম সুইট বলেন, “ইতোমধ্যে সারা বাংলাদেশে যেভাবে ছাত্রলীগ গুপ্ত কায়দায় সব জায়গায় ম্যাসাকার তৈরি করার চেষ্টা করছে, সে জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা থাকা দরকার। না হয়, বিগত অভ্যুত্থানের পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সম্প্রীতির নজির তৈরি হয়েছে, সেটির খুব দ্রুতই ব্যত্যয় ঘটবে এবং জবি, রাবি, বেরোবিসহ যেভাবে ক্যাম্পাসগুলোর অবস্থা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে সেটি ইবিতে হতে ও সময় লাগবে না। সে ক্ষেত্রে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা আহ্বান করব প্রত্যেকটা ছাত্র সংগঠনের কাছে, পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে, প্রশাসনকে এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ইবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, আমরা জুলাই বিপ্লব ঘটিয়েছিলাম একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূলোচ্ছেদ করবার জন্য। তবে আমরা যেটা দেখেছি যে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূলোচ্ছেদ হয়নি। শুধুমাত্র নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমরা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূল উদঘাটন এখন পর্যন্ত করতে পারি নাই। কয়েকদিন আগে শহীদ আনাসের পরিবার এসেছিল। তাদের পরিবারের লোকজন খুব আক্ষেপ করেছিলেন। এটা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার একটা বিষয় যে, খুনিকে ধরার পরেও তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়! যাদের ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে, তারা বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু যারা প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে দেওয়া হয়েছে তিন বছরের কারাদণ্ড। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রশাসন হচ্ছে জুলাইয়ের পক্ষের প্রশাসন,বাংলাদেশের পক্ষের প্রশাসন। সুতরাং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রকে আপনারা প্রশ্রয় দেবেন না।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন আমাদের সাহস, ত্যাগ ও ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে। সে সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সহজ ছিল না; জীবনকে তুচ্ছ করে মানুষ রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পর আমরা অনেক সময় এই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই, যা অতীতে নানা সংকটের কারণ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যদিও তারা অনেক ক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে। কোনো আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে দাবি করলে বিভাজন সৃষ্টি হয়, তাই জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই। অতীতেও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশ এগিয়েছে, ভবিষ্যতেও সেটিই পথনির্দেশক হতে হবে। জুলাই আন্দোলনের সময় যেমন কোনো ভেদাভেদ ছিল না, তেমনি এখনো সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যথায় ফ্যাসিবাদী শক্তি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই নতুন করে শপথ নিতে হবে, বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে , আবেগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকলকে সচেতন থাকতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা গণতান্ত্রিক উপায়ে বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে প্রতিষ্ঠানটি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে”।
উল্লেখ্য, বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভলিবল মাঠে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিভিন্ন আবাসিক হলের অংশগ্রহণে প্রীতি ভলিবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি নারীদের জন্য পিলো পাসিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে আবাসিক হলগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনসহ ৫ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ৬ আগস্ট ভোর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট, প্রশাসন ভবন, ভিসি বাংলোসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়।
