কোরবানি হোক সমাজবদ্ধ জীবন গড়ার সেতুবন্ধন: ডা. এম মুর্শেদ জামান মিঞা

প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক:


বাংলাদেশে কুরবানি শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়; এটি আমাদের সমাজজীবনের এক গভীর মানবিক উৎসব। কুরবানির পশু জবাই করার মধ্যেই এর পূর্ণতা নয়; বরং এর প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় গোশত বণ্টনের মধ্যে ও নিজে খাওয়া, আত্মীয় স্বজনকে দেওয়া, প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানো এবং দরিদ্র-অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, বিশেষ করে শহুরে ফ্ল্যাট সংস্কৃতির বিস্তারে, কুরবানির এই সামাজিক রূপ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একসময় গ্রাম, মহল্লা বা পাড়াভিত্তিক যে পঞ্চায়েত বা জামাত ব্যবস্থা ছিল, যেখানে কুরবানির গোশত একত্র করে দরিদ্র, কুরবানি দিতেত অক্ষম পরিবার এবং সমাজের সব সদস্যের মধ্যে সম্মানজনকভাবে বণ্টন করা হতো, সেই সুন্দর ঐতিহ্য আজ অনেক জায়গায় হারিয়ে যাচ্ছে।


রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকায় কুরবানির গোশত বণ্টনের একটি সুন্দর সামাজিক পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। সেখানে কুরবানির পর গোশত সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয় এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য, আর এক ভাগ সমাজ বা জামাতে জমা দেওয়ার জন্য। জামাতে জমা হওয়া গোশত প্রথমে তাদের দেওয়া হয়, যারা আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে কুরবানি দিতে পারেননি। এরপর অবশিষ্ট গোশত সমাজের সদস্যদের মধ্যে পরিবার-সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে বা স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার মধ্যে ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক ন্যায়বোধ, দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা এবং সম্মিলিত জীবনযাপনের এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।


এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এটি একজন মানুষকে লাইনে দাঁড় করায় না; বরং সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে অংশীদার করে। ধনী মানুষের বড় গরু, মধ্যবিত্তের ছোট গরু, কারও খাসি, কারও মহিষ সব গোশত যখন এক জায়গায় জমা হয়, তখন সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য কিছুটা হলেও কমে যায়। গরিব মানুষ আলাদা করে কারও দরজায় দাঁড়িয়ে দানের অপেক্ষা করে না; বরং সমাজের পক্ষ থেকে সম্মানজনকভাবে তার ঘরে গোশত পৌঁছে যায়। ফলে ঈদের আনন্দ কেবল সামর্থ্যবান মানুষের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমাজের প্রান্তিক ঘরেও পৌঁছে যায়।


বাংলােেশর বিভিন্ন অঞ্চলে কুরবানির গোশত বণ্টনের রীতি একেক একক রকম। বড় শহরগুলোতে অধিকাংশ পরিবার নিজেরাই গোশত ভাগ করে আত্মীয়, পরিচিত, গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, মসজিদের খাদেম, মাদ্রাসার ছাত্র বা দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, খুলনা বা রংপুর অঞ্চলেও আত্মীয়তা, পাড়া-মহল্লা, মসজি বা স্থানীয় সমাজভিত্তিক নানা পদ্ধতি খো যায়। কোথাও দরিদ্ররা বাড়ি বাড়ি যান, কোথাও আগে থেকে প্যাকেট করে রাখা হয়, কোথাও মসজি বা সমাজ কমিটি তালিকা করে বণ্টন করে। কিন্তু রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের মতো গোশত একত্র করে পুনর্বণ্টনের যে সামাজিক বা জামাতবদ্ধ পদ্ধতি, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ইবাদতকে সামাজিক সম্প্রীতির শক্তিতে রূপান্তর করার এক বাস্তব প্রক্রিয়া।


ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরবানির গোশত থেকে নিজে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং দরিদ্রকে খাওয়ানো এসবের মধ্যে রয়েছে আল্লাহভীতি, ত্যাগ ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা। প্রচলিতভাবে কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করার রীতি আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মানবিক চেতনাকে সামনে রেখেই। যদিও সব ক্ষেত্রে ওজন করে তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের আন› অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। তাই পঞ্চায়েত বা জামাতভিত্তিক গোশত বণ্টন যদি স্বেচ্ছায়, স্বচ্ছভাবে এবং দরিদ্রের মর্যাদা রক্ষা করে করা হয়, তবে তা ধর্মীয় উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত উপকারী।


আজকের শহুরে বাস্তবতায় এই ঐতিহ্য নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এখন একই বহুতল ভবনে বিশ, ত্রিশ বা পঞ্চাশটি পরিবার বসবাস করে, কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটির নামও অনেক সময় জানা থাকে না। লিফটে দেখা হয়, কিন্তু সালাম বিনিময় হয় না; একই ছাদের নিচে থাকা সত্ত্বেও কার ঘরে রোগী আছে, কার আর্থিক সমস্যা চলছে, কার সন্তান পড়াশোনার সমস্যায় আছে, কোন বয়স্ক মানুষ একা থাকেন এসব খবর তেমন কেউ রাখে না। আধুনিক ফ্ল্যাট সংস্কৃতি আমাদের নিরাপত্তা, আরাম ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দিলেও সামাজিক উষ্ণতা অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজের যে জামাতি চেতনা, পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এসব অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।


এই অবস্থায় কুরবানির পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শহুরে সমাজে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, আবাসিক কমপ্লেক্স বা মহল্লায় ঈদুল আজহার আগে একটি “কুরবানি সমাজ সহায়তা কমিটি” গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটির উদ্দেশ্য হবে কুরবানির গোশত শুধু ব্যক্তিগতভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা নয়, বরং প্রতিবেশী, রিদ্র, কুরবানি দিতে অক্ষম পরিবার, ভবনের নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহকর্মী, গাড়িচালক এবং আশপাশের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সম্মানজনকভাবে বিতরণ করা। একই সঙ্গে এটি হবে ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে পরিচয়, আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ার একটি সুযোগ।


এই উদ্যেগ শুরু হতে পারে খুব সহজভাবে। ঈদের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে ভবনের ছা, কমিউনিটি স্পেস, গ্যারেজ বা নিকটস্থ মসজিদে একটি ছোট সভা ডাকা যেতে পারে। সেখানে ভবনের বাসিন্দারা পরিচিত হবেন। একজন সভাপতি, একজন সমন্বয়ক, একজন হিসাবরক্ষক, কয়েকজন যুব স্বেচ্ছাসেবক, একজন মহিলা প্রতিনিধি এবং সম্ভব হলে একজন আলেম বা মসজিদের ইমামকে যুক্ত করা যেতে পারে। শুরুতেই স্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত এটি বাধ্যতামূলক নয়, কারও ওপর চাপ নেই, কে কত দেবে তা প্রকাশ করা হবে না। এটি হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক, মানবিক ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের উদ্যোগ।


পরবর্তী ধাপে একটি সম্মানজনক তালিকা তৈরি করা রকার। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, লিফটম্যান, গৃহকর্মী, ড্রাইভার, আশপাশের নিম্নআয়ের পরিবার, বিধবা, এতিম, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী বা কুরবানি দিতে অক্ষম পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। তবে এই তালিকা তৈরি করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, যাতে কারও আত্মসম্মান ক্ষুন্ন না হয়। কাউকে প্রকাশ্যে “গরিব” হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। বরং বলা যেতে পারে “আমরা ঈরে আন্য সবার সঙ্গে ভাগ করতে চাই।” দরিদ্রের মর্যাদা রক্ষা করা এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত।


কোরবানির দিন কোরবানিদাতা পরিবারগুলো নিজেরে ইচ্ছা অনুযায়ী গোশতের একটি অংশ “সমাজ ভাগে”দিতেপারেন। কেউ এক-তৃতীয়াংশ দেবেন, কেউ নির্ষ্টি কেজি দিবেন, কেউ হয়তো টাকা দেবেন, কেউ শ্রম দেবেন সব অংশগ্রহণই মূল্যবান। ভবনের নিচতলা বা নির্ষ্টি পরিচ্ছন্ন স্থানে সংগ্রহকেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে ওজন মেশিন, পরিষ্কার টেবিল, গ্লাভস, প্যাকেট, মার্কার, বরফ বা ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবক দল থাকবে। গোশত সংগ্রহ, ওজন, প্যাকেটিং এবং বিতরণ হবে পরিকল্পিতভাবে।


বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত কুরবানি দিতে অক্ষম পরিবার, রিদ্র, কর্মচারী ও প্রান্তিক মানুষ। তাদের ঘরে সম্মানজনকভাবে প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। কারও ছবি তুলে প্রচার করা, লাইনে দাঁড় করিয়ে অপমান করা বা সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শন করা উচিত নয়। এরপর যি গোশত অবশিষ্ট থাকে, তবে ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যেও ছোট “প্রতিবেশী হাদিয়া প্যাকেট” বিতরণ করা যেতে পারে। এক ফ্ল্যাট থেকে অন্য ফ্ল্যাটে একটি ছোট প্যাকেট গোশত পাঠানোর মধ্যে যে সম্পর্কের উষ্ণতা তৈরি হয়, তা অনেক সময় দীর্ঘেিনর অচেনা দেয়াল ভেঙে দেয়।


শহুরে ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচয় ও যোগাযোগ। ঈরে আগে একটি “প্রতিবেশী পরিচয় সভা” করা যেতে পারে, যেখানে প্রত্যেক পরিবার সংক্ষেপে নিজেদের পরিচয় দেবে। কার ঘরে প্রবীণ মানুষ আছেন, কার শিশু আছে, কার বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে এসব তথ্য জানা থাকলে ভবিষ্যতে বিপ-েআপে সহযোগিতা সহজ হয়। কোরবানির পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তাই শুধু গোশত বণ্টন নয়; এটি ভবনের মানবিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ার সূচনা হতে পারে।
এই উদ্যোগে নারী ও তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে অনেক সময় পুরুষরা কর্মব্যস্তা কেন, কিন্তু নারীরাই প্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। ভবনের মহিলাদের একটি ছোট সহায়তা গ্রুপ তৈরি করা যেতে পারে, যারা অসুস্থ পরিবার, নবজাতক শিশু থাকা পরিবার, একা থাকা প্রবীণ নারী বা গৃহকর্মীদের খোঁজ নেবেন। তরুণরা ডিজিটাল তালিকা তৈরি, স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনা, প্যাকেটিং, স্বাস্থ্যবিধি এবং বিতরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সামাজিক দায়িত্ববোধ ছড়িয়ে পড়বে।

তবে এই ব্যবস্থার কিছু সতর্কতাও জরুরি। প্রথমত, এটি যেন সামাজিক চাপ বা বাধ্যবাধকতায় পরিণত না হয়। কেউ সমাজে গোশত না দিলে তাকে অপমান করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, হিসাব-নিকাশ স্বচ্ছ হতে হবে। কত কেজি গোশত জমা হলো, কত পরিবার পেল, কত প্যাকেট বিতরণ হলো এসব সংক্ষিপ্তভাবে জানানো যেতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক, লীয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব যেন ঢুকে না পড়ে। চতুর্থত, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অপরিচ্ছন্নভাবে গোশত রাখা, দেরিতে বিতরণ, প্যাকেটিংয়ের ত্রুটি বা দূষণ খ্যানিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পঞ্চমত, দরিদ্রের মর্যাদা সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।


এই পদ্ধতির ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি বলি “দান করছি”, তাহলে তা-গ্রহীতার দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু যে বলি “আমরা ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছি”, “আমরা প্রতিবেশীর হক আদায় করছি”, “আমরা একই সমাজের মানুষ”তাহলে সম্পর্কের ভাষা বদলে যায়। কোরবানি আমারে অহংকার ভাঙার শিক্ষা দেয়। ধনী মানুষ যি নিজের হাতে গোশত প্যাকেট করেন, নিরাপত্তাকর্মীর বাসায় পৌঁছে নে, পাশের ফ্ল্যাটে হাদিয়া পাঠান, তাহলে সামাজিক শ্রেণিভে অনেকটাই নরম হয়ে আসে। শিশুরা খেবে ঈ মানে শুধু নতুন জামা, ভালো খাবার ও ফ্রিজ ভর্তি গোশত নয়; ঈদ মানে ভাগাভাগি, খোঁজ নেওয়া, বিনয় ও মানবিকতা।


আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি মানুষ স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে, অহংকার বাড়ছে, প্রতিবেশী সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, মুসলিম সমাজের জামাতবদ্ধ চেতনা দুর্বল হচ্ছে। কিন্তু শুধু অভিযোগ করে লাভ নেই; আমাদের বাস্তব উদ্যেগ দরকার। কোরবানির পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এমনই একটি বাস্তব, সহজ, ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত এবং সামাজিকভাবে কার্যকর উদ্যেগ। এটি কোনো বড় সরকারি প্রকল্প নয়; এটি পাড়া, মহল্লা, ভবন বা আবাসিক কমপ্লেক্স থেকেই শুরু করা যেতে পারে।


প্রতিটি ভবন চাইলে একটি সুন্দর নাম দিতে পারে “আমারে ভবন, আমাদের ঈদ”, “প্রতিবেশী কোরবানি সহায়তা কর্মসূচি”, “ কোরবানি সমাজ ভাগ উদ্যেগ” বা “ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি কমিটি”। নাম যা-ই হোক, উদ্দেশ্য হবে একটাই কেউ যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না থাকে, কেউ যেন নিজেকে একা মনে না করে, আর একই ভবনে থাকা মানুষগুলো যেন অন্তত ঈরে দিনে একে অপরকে মানুষ হিসেবে চিনতে ও জানতে পারে।


রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের পঞ্চায়েতভিত্তিক কোরবানি গোশত বণ্টন আমাদের দেখায়, সমাজ চাইলে ধর্মীয় ইবাদতকে সামাজিক ন্যায় ও মানবিক সম্প্রীতির শক্তিতে পরিণত করতে পারে। এই ঐতিহ্য শুধু গ্রামে সীমাবদ্ধ থাকার নয়; শহরেও এর আধুনিক রূপ প্রয়োগ করা সম্ভব। বরং শহরেই এর প্রয়োজন বেশি। কারণ গ্রামে মানুষ এখনো একে অন্যকে চেনে; শহরে মানুষ একই ভবনে থেকেও অপরিচিত।


কোরবানি গোশত শুধু রান্নাঘর বা ফ্রিজের সম্পদ নয়; এটি সমাজ গঠনের উপাদান। এই গোশতের একটি অংশ যদি প্রতিবেশীর রজায় ভালোবাসা হয়ে পৌঁছে যায়, যি নিরাপত্তাকর্মীর সন্তানের মুখে ঈরে হাসি আনে, যি পাশের ফ্ল্যাটের সঙ্গে প্রথম আলাপের সেতু তৈরি করে, যদি কোনো অসহায় পরিবারকে সম্মানের সঙ্গে ঈদের অংশীদার করে—তাহলেই কুরবানির সামাজিক উদ্দেশ্য সফল হয়।


আমাদের দরকার কোরবানি আত্মাকে আবার সমাজে ফিরিয়ে আনা। দরকার পঞ্চায়েতের সেই মানবিক চেতনা যেখানে ধনী-গরিব, মালিক-ভাড়াটিয়া, ফ্ল্যাটমালিক-কর্মচারী, পুরোনো-নতুন বাসিন্দা সবাই এক সমাজের অংশ। কোরবানি আমাদের শেখায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করতে হয়। আজকের শহুরে জীবনে আমাদের হয়তো পশুর সঙ্গে সঙ্গে অহংকার, বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং প্রতিবেশী-বিমুখতাকেও কোরবানি করতে হবে।


যদি প্রতিটি ভবনে, প্রতিটি মহল্লায়, প্রতিটি আবাসিক এলাকায় কোরবানি জামাত ব্যবস্থা নতুনভাবে চালু করা যায়, তাহলে ঈদুল আজহা শুধু ব্যক্তিগত উৎসব থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে সমাজ পুনর্গঠনের মহৎ উপলক্ষ। যে সমাজ কুরবানির গোশত ন্যায়ভাগে ভাগ করতে শেখে, সে সমাজ একদিন দুঃখ, বৈষম্য, নিঃসঙ্গতা ও অহংকারও ভাগ করে কমাতে শিখবে। কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা ইবাদত থেকে মানবতা, আর মানবতা থেকে সমাজ।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হেমাটোলজি বিভাগ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক:
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক:
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন

যোগাযোগ:
বাড়ি ০১, রোড নং-১১, সেক্টর- ১৩, উত্তরা ঢাকা-১২৩০

মোবাইল :
০১৭১৪-৯০৮৫৪৫

ইমেইল :
citizenvoicebd2020@gmail.com

সর্বশেষ

© All rights reserved © 2026 Dailycitizenvoice