রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য প্রফেসর ডা. মো. জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্রে অংশ না নিয়েই দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঘুষের মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে। সেই অভিযোগের বরাত দিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। সোমবার (২মার্চ) রামেবির পক্ষ থেকে এক প্রতিবাদ বিবৃতিতে এমনটা জানানো হয়।
প্রতিবাদ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, কয়েকটি গণমাধ্যমে ‘উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রকল্পের ৯ শতাংশ ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ একপাক্ষিক, ভিত্তিহীন এবং অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে করা জেনিথ কর্পোরেশন এবং তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ এর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সত্যতা যাচায় না করেই সাজানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এসকল মিথ্যা অভিযোগকারি প্রতিষ্ঠান জেনিথ কর্পোরেশন এবং তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ অদ্যবধি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রকল্পের কোনো দরপত্রে অংশগ্রহণ করেনি। যেহেতু তারা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রকল্পের কোনো দরপত্রে অংশগ্রহণই করেনি সেক্ষেত্রে তাদের নিকট ঘুষ চাওয়ার অভিযোগটি যে মিথ্যা তা সুস্পষ্ট। তারা শুধুমাত্র তাদের দাপ্তরিক প্যাড ব্যবহার করে নিজেদের অসৎ উদ্দ্যেশ্য হাসিলের জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করার জন্য এসকল মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
কারণ ব্যাখ্যা করে রামেবি জানায়,
প্রকৃত তথ্য ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিম্নরূপ:
- টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অবৈধ হস্তক্ষেপের চেষ্টা: ‘জেনিথ করপোরেশন’-এর মালিক আতাউর রহমান টিপু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। তিনি বলেন টেন্ডার ডাটা শিট (TDS) তার দেওয়া শর্ত অনুযায়ী সাজাতে হবে, যা পিপিআর (PPR) বহির্ভূত। তিনি Specific Experience কমানোর জন্য চাপ প্রদান করতে থাকেন এবং ITT Clause অনুযায়ী Specific Experience দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের 50% – 80% এর মধ্যে রাখার কথা বলা থাকলেও তিনি ৫০% এর নিচে করার জন্য চাপ প্রদান করছেন যা বিধিসম্মত নয়। নিয়মবহির্ভূতভাবে দরপত্র শর্ত না দেওয়ায় তিনি এই মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন।
- রাজনৈতিক প্রভাব ও হুমকি প্রদান: আতাউর রহমান টিপু বিগত পতিত সরকারের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও তিনি নিজেকে দেশের শাসনতত্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রামেবি কর্মকর্তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও করেছেন।
- শারীরিক লাঞ্ছনা ও প্রাণনাশের হুমকি: কাজ না দিলে উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট’ বা শারীরিক লাঞ্ছনা করা হবে বলে তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। গত ২৪/১২/২০২৫ খ্রি. তারিখে উপাচার্য মহোদয়কে হোয়াটসএপ এ ভয়েস মেসেজ প্রেরণ করেন, যেখানে তিনি বলেন, দেশ আমরা পরিচালনা করব সুতরাং আমাদের শর্ত মোতাবেক TDS সাজাতে হবে মর্মে হুমকি প্রদান করেন। রামেবির মাননীয় উপাচার্য ছাড়াও পরিচালক (প.উ.), সেকশন অফিসার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন হুমকি প্রদান করেন ‘জেনিথ করপোরেশন’-এর মালিক আতাউর রহমান টিপু । তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে।
- ডিজিটাল প্রমাণাদি: আতাউর রহমান টিপু কর্তৃক কর্মকর্তাদের দেওয়া এসব হুমকি-ধামকি, অনৈতিক আবদার এবং প্রভাব খাটানোর যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ (হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের স্ক্রিনশট এবং ভয়েস রেকর্ড) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজনে এসব প্রমাণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিকট উপস্থাপন করা হবে।
সবশেষ রামেবি থেকে জানানো হয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি মেগা প্রকল্প সকল সরকারি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ পূর্বক স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়নে কাজ করছে। জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির সাজানো গল্প কোনো যাচাই ছাড়া প্রকাশ করা দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে, রামেবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন ভিসি প্রফেসর ডা. মো. মোস্তাক হোসেন রামেবি থেকে বিদায় নেন। রামেবিতে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। বিশেষভাবে ভেঙে পড়ে একাডেমিক সকল কার্যক্রম। সেশনজটের কবলে দিশেহারা হয়ে পড়েন কয়েক রামেবি অধিভুক্ত অর্ধ শতাধিক কলেজের কয়েক হাজার মেডিকেল ও নার্সিং অনুষদের শিক্ষার্থী। কার্যক্রম সচল করে পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে স্মারকলিপি দেন রামেবির নার্সিং অনুষদের শিক্ষার্থীরা। সেপ্টেম্বরে রাজপথেও নেমে আসেন। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রতীকি বিষপান ও আন্দোলনে নেমে প্রায় ২০ জন নার্সিং শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় সপ্তাহখানেক লাগাতার আন্দোলনের পর ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (আরএমসি) কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাওয়াদুল হককে রামেবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের চিকিৎসা শিক্ষা-১ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তাকে নিয়োগের বিষয়টি জানলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে সরে আসেন। দায়িত্ব পেয়েই সকল রামেবিকে সচল করা শুরু করেন প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাওয়াদুল হক। নির্ধারিত সময়ে একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
রামেবির সাবেক শিক্ষার্থীরা বলছেন, তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি। তিনি সততার সাথেই দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা মানহানিকর বলেও জানিয়েছেন তারা।
