রাজশাহীতে এক মাস পেরিয়ে গেলেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট কোনোভাবেই কাটছে না। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার জেরে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের সঙ্গে কর্মচারীদের বাগবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যখনই কোনো ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল দেওয়া হবে বলে প্রচার হচ্ছে, সেখানে আগের দিন বিকেল থেকেই মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। তেল পাওয়ার আশায় চালকরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন রাস্তায়।
দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষারত যানবাহন চালকরা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আফরিন ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার মো: ফারুক জানিয়েছেন চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ একেবারেই অপ্রতুল। স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল তারা এক সপ্তাহে বিক্রি করতেন, বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চাহিদার চাপে তা মাত্র এক বেলাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক গ্রাহককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, যা থেকে অসন্তোষ ও সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে।
এদিকে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। এর ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অফিসেও নানা জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হচ্ছে সাধারণ কর্মজীবীদের।
জ্বালানি নিতে আসা ভুক্তভোগী ফয়সাল ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের দিনের বেশিরভাগ সময় নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা ঠিকমতো কর্মস্থলে যেতে পারছি না। সেখানে সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় অফিসিয়াল একটা চাপ তৈরি হচ্ছে।”
অফিসের কাজ শেষ করে পাম্পে এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের পুরো দিনই শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এই পরিস্থিতির কারণে ব্যক্তিগত জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ওই ভুক্তভোগী আরও বলেন, “তেল নেওয়ার এই ভোগান্তির কারণে আমরা পরিবারকেও ঠিকমতো সময় দিতে পারছি না, আবার কর্মস্থলেও যেতে পারছি না। আমাদের দিনটাই এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
এছাড়াও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা। সারারাত পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তেল। এতে করে তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
তেলের জন্য অপেক্ষারত এক ফুডপান্ডা ডেলিভারি কর্মী পিয়ারুল অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “সারারাত জেগেও তেল পাইনি, এখন পর্যন্ত পাইনি। আজকে সারাদিন আমার আর কাজে বের হওয়া হবে কিনা, তা আমি জানি না।”
প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই কর্মীরা জানান, তেলের অভাবে তাদের উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হতাশা প্রকাশ করে ওই রাইডার বলেন, “আমার সংসারের খরচের জন্য যে ইনকাম, সেটা আজ বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে প্রতিদিন তেল নিতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আর লাইন শেষ হওয়ার আগেই তেল ফুরিয়ে যায়। আয়ের দিক থেকে আমি অনেক পিছিয়ে যাচ্ছি এবং আমার ইনকাম আস্তে আস্তে একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
শুধু পিয়ারুলের ডেলিভারি বক্তব্যটি শুধু তার একার নয়, বরং শহরের অসংখ্য রাইডারের বর্তমান পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র। প্রতিদিন এমন ভোগান্তির শিকার হয়ে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। তেলের এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষদের জীবনযাত্রা আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোস্তাফিজুরের এ সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তার অসহায়ত্বের কথা কিছুটা আক্ষেপ এবং কিছুটা হাস্যরসের সুরে তুলে ধরে বলেন, বাচ্চা বাসাতে। স্কুল যাওয়া বন্ধ। কী করবো, তেলের প্রয়োজন ভাই! আগে তেলের প্রয়োজন, বাচ্চার স্কুলের প্রয়োজন পরে হয়ে গেছে।”
তার এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ের ভোগান্তির একটি খণ্ডচিত্র। দৈনন্দিন জীবনে চলাচলের জন্য তেলের ওপর মানুষ কতটা নির্ভরশীল এবং এর জন্য মানুষকে কতটা মরিয়া হতে হচ্ছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই ব্যক্তির কথায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাধ্য হয়ে পরিবারের জরুরি অবস্থার চেয়েও তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থার দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন চরম ভোগান্তিতে থাকা এই সাধারণ মানুষগুলো।